রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯


ওমানে দুতাবাসঃ কোটিপতি এক সাবেক টি বয়ের কাহিনী !





 

ওমান প্রতিনিধিঃ

ছিলেন সাধারণ একজন টি-বয়, দূতাবাসে সিনিয়র অফিসারদের চা খাওয়ানোই ছিলো তার কাজ, সাবেক রাষ্ট্রদূত নুরে আলম চৌধুরীর সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় তার সময়ে এই টি বয় বড় ধরনের লিফট পান। চা বয় থেকে আস্তে আস্তে হয়ে যান দূতাবাসের একজন প্রভাবশালী দালাল।

জানা গেছে, ২০১০ সালের ২২ মে ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন নুরুল আলম চৌধুরী। ৬ বছর আগে বাংলাদেশ দূতাবাস ওমানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত নুরে আলম চৌধুরীর মাধ্যমে দূতাবাসের একজন পিয়ন হিসেবে ওমানে আসেন আলোচিত মাসুদ।

চাকরী জীবনের মাত্র ছয় সাত বছরেই আঙুল ফুলে তিনি এখন কলা গাছ। ২০১৫ এর ৫ এপ্রিল তারিখে অসহায় অবৈধ প্রবাসীদের জন্য ওমান সরকার থেকে আউট পাস ঘোষণা করলে, ওইসময় দূতাবাসে এই মাসুদ একটা সিন্ডিকেট বানিয়ে ফেলেন। এর পর থেকেই শুরু হয় তার নতুন জীবন।

প্রতি আউট পাস থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী মাসুদ মাস্কাটে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এটিকে একটি আড্ডাস্থলে পরিণত করেছেন।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে দূতাবাসের ভিতরেই দোকান দিয়ে বেশ রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছেন এই মাসুদ। চাকরী জীবনের মাত্র ৬ বছরেই দেশে অঢেল সম্পত্তির পাহাড় গড়েছেন। চট্টগ্রামের মুরাদপুরে পাঁচ তলা বাড়ি, গ্রামে নিজস্ব জমি এবং অন্যান্য ব্যবসা মিলে প্রায় কয়েক কোটি টাকার মালিক এখন এই মাসুদ। দূতাবাসের পিওন পদমর্যাদার একজন সাধারণ কর্মচারী হয়েও কিভাবে এমন অঢেল সম্পত্তির মালিক হলেন এই প্রশ্ন এখন সকলের মুখে মুখে !

অসহায় ওমান প্রবাসীদের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই এই মাসুদের নামে বিভিন্ন অভিযোগ আসে, এটা এখন ওপেন সিক্রেট।

দূতাবাসে মাসুদের মতো এমন অসৎ লোক থাকার কারনে ওমানের সাথে দূতাবাসের সম্পর্ক খুবই খারাপ যাচ্ছে। বর্তমানে ওমানে প্রায় ৬০,০০০ (ষাট হাজার) এর মতো বাংলাদেশী অবৈধভাবে বসবাস করছে। শুধুমাত্র একটি আউটপাসের অপেক্ষায় তারা দিন গুনছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী ওমান সরকারের সাথে দূতাবাসের সম্পর্ক ভালো না হওয়ায় আট লক্ষাধিক মানুষ এর সেবা ও ঠিক মতো দিতে পারছেনা বাংলাদেশ দূতাবাস ওমান।

কিছুদিন পূর্বে মাস্কাটের হামরিয়া থেকে একরাতে প্রায় ৪০০ লোক গ্রেফতার করে ওমান পুলিশ, যাদের ভিতর ৯০% ই ছিলো বাংলাদেশী, এদের ভিতর অধিকাংশেরই ভিসা পতাকা ছিলো।

ভিসা পতাকা থাকা সত্বেও কেনো তাদের গ্রেফতার করা হলো এই ব্যাপারে দূতাবাসের পক্ষ থেকে ওমান সরকারের কাছে জানতে পর্যন্ত চাও্যা হয়নি। অথচ পাকিস্তান দূতাবাস এর পক্ষ থেকে সেই রাতেই ওমান পুলিশ কে ফোনকরে তাদের বৈধ লোকদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায় এবং ভবিস্বতে এমন ঘটনার যেনো পুনরাবিত্তি না ঘটে সেই মর্মে হুশিয়ারি করা হয়।

অথচ বাংলাদেশ দূতাবাস সবসময় নিরব ভুমিকা পালন করে। এমনকি দূতাবাসের সাথে ওমানে বসবাসরত সিনিয়র বাংলাদেশী প্রবাসীদের সাথেও ভালো সম্পর্ক নাই। কমিউনিটির কয়েকজন তেলবাজ নামধারী নেতার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছাড়া কারো সাথেই সম্পর্ক নাই দূতাবাসের।

বিদেশে প্রবাসী শ্রমিক মারা গেলে সরকারী ভাবে দূতাবাসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনা খরচে মরদেহ দেশে আনার কথা থাকলেও এর ফল আজ অবধি কেউই ভোগ করতে পারেনি।

শুধুমাত্র দূতাবসের সাথে যাদের সম্পর্ক ভালো, একমাত্র তারাই এর কিছুটা ফল ভোগ করছে। বিতর্ক আছে বাংলাদেশ স্কুল মাস্কাট নিয়েও। প্রতিষ্ঠানটি কমিউনিটির হলেও, মুলত এটা সম্পূর্ণ পরিচালিত হয় রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে। সম্প্রতি স্কুলের পরিচালনা পরিষদ নিয়ে নানা বিতর্ক উঠে, স্কুল পরিচালনার জন্য কিছুদিন পূর্বে নির্বাচন হলেও নির্বাচিতদের বাদ দিয়ে দূতাবাসের সিলেক্টেড ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করা হয়। যা নিয়ে কমিউনিটির নেতাদের মাঝে চরম ক্ষোভ আজও বিরাজমান।

এর বাইরেও মাসুদের বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া অসহায় প্রবাসীদের সাথে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। ঘুষ ছাড়া যেনো তারা কোনো কাজই করতে পারেনা। দূর দূরান্ত থেকে দূতাবাসে সেবা নিতে আসা অসহায় প্রবাসীদের তারা মানুষই মনে করেনা। ওমানে এখন আউট পাশ সুবিধা না থাকলেও, মাসুদ তার টেকনিক্যাল সিস্টেমে প্রায়ই টাকার বিনিময়ে আউট পাস দিয়ে ওমান থেকে দেশে লোক পাঠিয়েছে।

ওমানের কোনো অসহায় প্রবাসী তার মা মারা গেলেও মাসুদের কাছে গেলে আউট পাস পায়না, অথচ দুবাই থেকে এসে কেউ আউট পাসের আবেদন করলে ৩০০ থেকে ৫০০ রিয়ালের বিনিময়ে ঠিকই আউট পাসের ব্যবস্থা করে দেয় এই মাসুদ। এছারাও  আউট পাসের টিকেট পুরোপুরি তার দখলে। কেউ আউট পাস নিলে তার থেকেই বিমানের টিকেট কিনতে হবে। মাসুদ এভাবে বিমানের টিকেট থেকেও একটা আলাদা কমিশন খেয়ে আসছে। আপাদমস্তক এমন দুর্নীতিবাজ এমন একজন ব্যক্তি কিভাবে ৬ বছর যাবত দূতাবাসে চাকরি করছে এই প্রশ্ন এখানে সবার। এই ব্যাপারে কথা বলতে না চাওয়ায় মাসুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



প্রকাশক ও সম্পাদক : শাহিন রহমান

অফিস : ১১৪ নাখালপাড়া, ঢাকা-১২১৫
Email : prothomshomoy@gmail.com