মঙ্গলবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
  • হোম » মুক্তমত » ১২ নভেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপকূল দিবস পালন করা হোক


১২ নভেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপকূল দিবস পালন করা হোক





দেশের পুষ্টি ও প্রাণিজ চাহিদার বেশিরভাগ জোগানদাতা হলো উপকূলীয় অঞ্চল। কিন্তু যে উপকূল দেশের প্রালভ্রোমরা, তা থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত। বিশ্বের ইতিহাসের ভয়াবহ প্রাণহানি এ উপকূলে হয়েছিল। টেকসই উপকূলের উন্নয়ন তাই আজ সকলের প্রাণের দাবি। বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন ট্রেন্ড আজ উপকূলকেন্দ্রিক। বলতে গেলে নানা রকমের তথ্য-উপাত্তের বিচার বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভাবে উপকূলের উন্নয়ন স্থবির। তাই গবেষণা ও উন্নয়ন এ অঞ্চলের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। তার জন্য দরকার গবেষণা ফান্ডের এবং তার যথাযথ ব্যবহার বৈজ্ঞানিক গবেষণায়।

হাতিয়া, সন্দ্বীপ ও ভোলার মূল ভূখণ্ড ভাঙ্গার মূল কারণ ছিল ১৯৬০-৬৪ সালের দিকে ভবানীগঞ্জের চরলরেন্সে ক্রসড্যাম ও ১৯৬৭ সালে আরো একটি ক্রসড্যাম দেয় মান্নান নগরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কোনো রকমের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়া। এছাড়াও ১৯৯৬-২০০০ সালে ভোলায় নদী ড্রেজিং। তার ফলস্বরূপ ২০০৭ সালে হাতিয়ায় ভয়াবহ বন্যা ও সম্প্রতি স্বর্নদ্বীপ রক্ষার নামে ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে হাতিয়ামুখী করা হয়েছে। তার ফল পেতে একটু অপেক্ষা করুন। এর ফলে হাতিয়ার ভাঙন আরো বেশি তীব্রতর হয়েছে। পাতারচর বিলুপ্তি ও কেয়ারিংচর বিলুপ্তির পথে। নদী ভাঙনের ফলে হাতিয়াতে প্রতি বছর ক্ষতি হয় ৭০ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১৯৬০ হতে অদ্যাবধি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। হারিয়েছে সাজানো বাস্তুভিটা, পেয়েছে নতুন চর।

ওয়েব স্টার নামক একটি এনজিও দাবি করছিল- হাতিয়ার নদী ভাঙন ১৮৯০ সালের দিকে শুরু হয় তার কোন ভিত্তি নেই। কেননা তা যদি হতো তাহলে ক্রসড্যাম হাতিয়াঘেঁষে হতো। চরলরেন্স ও মান্নান নগরের ক্রসড্যামই ১২ নভেম্বর ১৯৭০ ও ২৯ এপ্রিল ১৯৯১ সালের সাইক্লোন ও ১৯৬০ সালের দিকে নদী ভাঙনের সূত্রপাতের জন্য দায়ী। বিভিন্ন সমীক্ষা তাই বলে। কেননা ১৯৬০ সালের দিকে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯৬০, ’৬১, ’৬৩, ’৬৫, ’৬৬ পর্যন্ত ছোট ছোট বন্যা হয়। এ ছোট ছোট বন্যাই বড় কোনো অঘটনের পূর্বসংকেত ছিল। অথচ গর্দভগুলো একটুও বুঝতে পারল না।

তার পরে ১৯৭০ সালে হলো বিশ্ব ইতিহাসের ভয়াবহ সাইক্লোন। এতে ৫ লাখ লোক নিহত হয়। কোনো কোনো সূত্র বলছে, তা ১০-১২ লাখ। শুধু হাতিয়ায় মারা যায় ২-৩ লাখ। নিঃস্ব হয় কয়েক লাখ পরিবার। ক্ষয়ক্ষতি হয় তৎকালীন ৫০ কোটি টাকার সম্পদ। ওই সময় হাতিয়ার মানুষকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে আসেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মজলুম নেতা মওলান আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার অন্যতম কারণ দেখিয়েছিলেন ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে পাকিস্তানীদের অসহযোগিতা।

এরপর দেশ স্বাধীন হলেও উপকূলের ভাগ্য বদলায়নি। ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত কয়েকটি ছোটখাটো বন্যা হয়। পরর্বতীতে ১৯৯১ সালে আরো একটি ভয়াবহ সাইক্লোন হয়। এতে হাতিয়াতে নিহত হয় প্রায় লাখের মতো এবং নিঃস্ব হয় ৩ লাখ মানুষ। এতে ক্ষয়ক্ষতি ধরা হয় ৭০ কোটি টাকা।

বিভিন্ন ইতিহাস বলে, নদীর উজানে বাঁধ দিলে তা ভয়াবহ বন্যা /সাইক্লোনের সৃষ্টি করে। কারণ প্রকৃতি তার আপন গতিতে চলে, কারো মন গড়া গতিতে নয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিতে বাধা দিলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। এ বাঁধগুলোর ফলে ন্যাচারাল ইকোসিস্টেমের এমন ক্ষতি হলো যে, তা মারাত্নক সাইক্লোনের দিকে ধাবিত করল। একটি সাইক্লোন হওয়ার পরও তা স্ট্যাবল হয়নি, পরবর্তীতে আরো একটা সাইক্লোন হলো। এটাতে নিঝুমদ্বীপে ক্রসড্যামের প্রভাবও ফেলে দেয়া যায় না।

অনেকে বলবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাইক্লোন হয়েছে। তা মোটেও সত্য নয় । কেননা জলবায়ু পরিবর্তন হলে তাপমাত্রা বাড়বে, তাপমাত্রা বাড়লে পানির আয়তন বাড়বে। মূল ভূখণ্ড ডুবে যাবে, নদী ভাঙন বাড়বে এবং ছোটখাটো ঝড়, বন্যা হবে। কিন্তু এমনটা হয়নি এবং ১৯৯১-এর পর আর বড় কোনো সাইক্লোনও হয়নি কিংবা ১৯৬০ সালের আগেও কোনো সাইক্লোন হয়নি ১৫০০ সালের দিকে জেগে ওঠা এই দ্বীপে। বরং প্রতি বছর নতুন চর জেগেছে উত্তর দিক হতে বয়ে আসা নদীতে কয়েকটন পলির ফলে।

তাহলে এখন কি জলবায়ুর প্রভাব নেই কিংবা ১৯৬০ সালের পূর্বে জলবায়ু ছিল না? ড্যামের ফলে নদীটির গতিপথ হাতিয়ামুখী হয়। ফলশ্রুতিতে নদীটির ৩০৮৬৮ ঘনমিটার বেগে সরাসরি আরো বেশি জোরে চাপ প্রয়োগ করে উপকূল চেপে, এতে ভাঙন আরো তীব্রতর হয়।

লাখ লাখ মানুষ নদী ভাঙনের শিকার হলো, কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ হারাল পাকিস্তানিদের ভুল সিদ্ধান্তে। ফলে যে গণহত্যা হলো তার দায়ভার কে নেবে? অন্যান্য হিসাব বাদ দিলাম, শুধু দুই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে হাতিয়ার প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে প্রায় ২০০ জন ( দুই ঘূর্ণিঝড়ে নিহতের সংখ্যা বিভিন্ন রিপোর্ট অনুসারে ৩ লাখ এবং বসবাসরত মোট ভূখণ্ডের আয়তন ১৫০০ বর্গকি.মি ধরে) করে নিহত হয়েছে। অথচ দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রতি বর্গকি.মিটারে শহীদের সংখ্যা গড়ে ২০ জন (১৪৭৫৭০ বর্গকি.মিটারে ৩০ শহীদ ধরে) করে। উভয়ের উদ্দেশ্য ছিল দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা। এতগুলো লাশের ভার আমরা কেমনে সইব।

তাই ১২ নভেম্বর উপকূলীয় দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করার দাবি জানাচ্ছি। এ দু সাইক্লোনে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ, নদী ভাঙনের শিকারদের প্রকৃত সংখ্যার হিসাব ও ক্ষতিপূরণের দাবি করছি। এরা শহীদ কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের ছেয়ে কম কোথায়? অথচ তাদের শহীদের মর্যাদা কি আজও রক্ষা করতে পেরেছি? ওদের আত্না কি আজও কেঁদে ওঠে না? স্বর্ণদ্বীপ রক্ষার নামে ড্রেজিং ও ক্রসড্যাম-৩-এর নামে আরো একটি ভয়াবহ সাইক্লোনের মুখোমুখি হচ্ছেন না তো অসহায় দ্বীপের বাসিন্দারা? দ্বীপ রক্ষার্থে এতগুলো জীবন ও সম্পদহানি বিশ্বের ইতিহাসে আর খুঁজে পাবেন না।

লেখক : মো রিপাজ উদ্দিন, তথ্যসূত্র : সম্ভাবনাময় হাতিয়া বাংলার সিঙ্গাপুর



প্রকাশক ও সম্পাদক : শাহিন রহমান

অফিস : ১১৪ নাখালপাড়া, ঢাকা-১২১৫
Email : prothomshomoy@gmail.com